জামায়াতসহ ১০ দলীয় নির্বাচনী জোটে এনসিপি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা আট দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করেছে। রোববার সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। যদিও আসন সমঝোতার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহত্তর স্বার্থেই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন করেছে দলটি। যারা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। এর আগে বিকেল ৫টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এনসিপি ও এলডিপিকে নিয়ে জামায়াতের নেতৃত্বে ১০ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতা জোট হয়েছে। সবাই মিলে আমরা একটি ভালো নির্বাচন করতে চাই। আসন বণ্টনের বিষয়ে এখনো কিছু আলোচনা বাকি আছে। শেষ পর্যায়ে যুক্ত হওয়া দুই দলের কারণে কিছু কারিগরি বিষয় রয়ে গেছে, যা মনোনয়ন দাখিলের পর পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। তিনি বলেন, জোটের সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে। আসন সমঝোতা প্রায় শেষ হয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের পর আসন বণ্টন চূড়ান্ত হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে আসন তুলে দেয়া হবে। জামায়াতের আমির বলেন, এখনো সব দলের জন্য সমতল মাঠ তৈরি হয়নি। এটি তৈরির দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। তারা যেন যেকোনো ধরনের লোভ-লালসা, ভয়ভীতি এবং কারো প্রতি কোনো ধরনের আনুকূল্যের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের দায়িত্ব পালন করে। জাতি তাদের কাছে সেই প্রত্যাশাই করে। এর ব্যতিক্রম জাতি মানবে না। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে কেউ ভোটের অধিকার হরণ করতে চাইলে সেটি বরদাশত করা হবে না। আগে থেকে এ জোটে থাকা আট দল হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন, খেলাফত মজলিসের আহমদ আব্দুল বাছেত, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধানসহ আট দলের শীর্ষ নেতারা। জোটে নতুন করে যোগ দেয়া এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও কোনো কথা বলেননি। জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনের পর রাত ৮টায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকে এনসিপি। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা শুরু থেকেই ৩০০ আসনে নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছিলাম। এরপর সংস্কার প্রশ্নে দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল। তবে শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করে শহীদ করার পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের মনে হয়েছে, দেশে আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসনবাদী শক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যাদেরকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তারা এখনো নির্বাচন বানচাল, সংস্কার ও নতুন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত এবং জুলাই প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত করছে। এ পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন। সে তাগিদ থেকেই আমরা জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সমমনা আট দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় সম্মত হয়েছি। নাহিদ ইসলাম জানান, জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো আদর্শিক ঐক্য হয়নি। এটি একটি নির্বাচনী সমঝোতা। জুলাই-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষা যাতে ব্যাহত না হয়, সেজন্যই এ ঐক্যে পৌঁছানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এ নির্বাচনী সমঝোতা শুধু নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্যই নয়, বরং বিচার ও সংস্কার প্রশ্নে এনসিপির কর্মসূচিতেও আমরা একসঙ্গে কাজ করব। জুলাই-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষা যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য ঐক্যে পৌঁছেছি। আগামীকাল (আজ) প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেব। এর আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে শনিবার চিঠি দেন ৩০ নেতা। জামায়াত জোটে যোগ দেয়াকে কেন্দ্র করে দলটির জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা পদত্যাগও করেছেন। এর মধ্যে গতকাল পদত্যাগ করেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। ঢাকা-১৭ আসনে তাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল এনসিপি। আগের দিন শনিবার পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এনসিপিতে জামায়াতবিরোধী অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য মীর আরশাদুল হক। এছাড়া নওগাঁ-৫ আসনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফেনী-৩ আসনে এনসিপির প্রার্থী আবুল কাশেম দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এনসিপির প্রার্থী আহমেদুর রহমান তনু। কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, দলীয় ফোরামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী সমঝোতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভিন্নমতের কারণে কেউ পদত্যাগ করলে এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে দলের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, আরিফুল ইসলাম আদীব, আবদুল হান্নান মাসউদ, মাহমুদা মিতু, দিলশানা পারুল প্রমুখ। এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা ও সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, তিনি এই এনসিপির অংশ হচ্ছেন না। জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা দেয়ার পর গতকাল রাতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি তার এ অবস্থানের কথা জানান। পোস্টে তিনি বলেন, আমাকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়নি, এটা সত্য নয়। কিন্তু ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চাইতে আমার লং স্ট্যান্ডিং পজিশন (দীর্ঘদিনের অবস্থান) ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, এনসিপিকে একটা বিগ জুলাই আমব্রেলা আকারে স্বতন্ত্র উপায়ে দাঁড় করানোর জন্য আমি সকল চেষ্টাই করেছি। কিন্তু অনেক কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।



















