৩০ দিনের ব্যবধানে দশবার ভূমিকম্প, উদ্বেগে বাসিন্দারা
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ কম্পন শুরু হলে কয়েক সেকেন্ড ধরে ভবন ও স্থাপনা দুলতে থাকে। এতে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বাসা-বাড়ি ও অফিস থেকে দ্রুত খোলা স্থানে বেরিয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাৎক্ষণিকভাবে কম্পনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিলআশাশুনি উপজেলা, যাসাতক্ষীরা জেলা–র অন্তর্গত। উৎপত্তিস্থল তুলনামূলকভাবে দূরে হলেও কম্পন দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়।
প্রাথমিকভাবে কোথাও হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প দেশের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। তারা ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনীয় নকশা অনুসরণ এবং নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, চলতি মাসেই এটি নিয়ে দশবার ভূমিকম্প অনুভূত হলো দেশে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বারবার ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ও ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্প নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর সহকারী আবহাওয়াবিদফারজানা সুলতানা–র দেওয়া বুলেটিনে জানানো হয়েছে, দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ভূকম্পনটি অনুভূত হয়। কম্পনটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল।
বুলেটিনে আরও উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল অক্ষাংশ ২২ দশমিক ৫১ ডিগ্রি উত্তর ও দ্রাঘিমা ৮৯ দশমিক ১৭ ডিগ্রি পূর্বে, যাআশাশুনি উপজেলা, সাতক্ষীরা জেলাএলাকায় অবস্থিত।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারুবাইয়াৎ কবীরবলেন, এটি একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। যে এলাকায় কম্পনের উৎপত্তি হয়েছে, সেটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। অতীতেও এ এলাকায় কয়েকবার ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এ অঞ্চলে ঘনঘন ভূমিকম্পের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কম্পন প্রাকৃতিকভাবেই সময় সময় হয়ে থাকে। এটি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ারই অংশ, তাই অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভূমিকম্প সম্পূর্ণভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়—এ কারণে নাগরিকদের সচেতন থাকা জরুরি। বিশেষ করে ভূমিকম্পের সময় করণীয়, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। সচেতনতা ও প্রস্তুতিই সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়।
এদিকেUnited States Geological Survey (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, উৎপত্তিস্থলে ভূকম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, কম্পনটির কেন্দ্রস্থল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ছিল।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপকহুমায়ূন আখতারগণমাধ্যমকে বলেন, পরপর দুই দফায় এ কম্পন অনুভূত হয়। তিনিও জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা অঞ্চল। বিভিন্ন সংস্থার উপাত্তে মাত্রায় সামান্য পার্থক্য থাকলেও উৎপত্তিস্থল নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণে মিল রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা–র বাসিন্দারা ভূমিকম্পে জোরালো ঝাঁকুনি অনুভব করেন। আকস্মিক কম্পনে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বাসাবাড়ি ও দালান থেকে দ্রুত বাইরে রাস্তায় নেমে আসেন। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ কম্পনে স্থানীয়ভাবে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাশের দেশ ভারতেরকলকাতাসহপশ্চিমবঙ্গ–এর অন্যান্য জেলাতেও কম্পন অনুভূত হয়। সেখানে রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় একই সময়ে কম্পন অনুভূত হওয়ায় এ ভূমিকম্পটি আঞ্চলিকভাবেও প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে গত বুধবার রাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরেক দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই কম্পনের মাত্রা রিখটার স্কেলে ছিল ৫ দশমিক ১, যা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বুধবারের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশমিয়ানমার–এ। উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশে অনুভূত হয়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই রাজধানীঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১০ দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও বারবার কম্পনে জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্প নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যও একই প্রবণতার কথা বলছে।United States Geological Survey (ইউএসজিএস) এবংEuropean-Mediterranean Seismological Centre (ইএমএসসি)–এর উপাত্ত অনুযায়ী, এ মাসের ২৭ দিনে দেশে বা দেশের নিকটবর্তী অঞ্চলে ১০ বার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভূকম্পনের পুনরাবৃত্তি তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও অধিকাংশই ছিল নিম্ন থেকে মাঝারি মাত্রার।
এর আগের দিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে দেশের বিভিন্ন অংশ আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর তথ্য অনুযায়ী, ভূকম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ দশমিক ৬। উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতেরসিকিমঅঞ্চল, যা রাজধানীঢাকাথেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
চলতি মাসের প্রথম দিনও দেশের কিছু এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় সেই কম্পন রেকর্ড করা হয়, যার মাত্রা রিখটার স্কেলে ৩। উৎপত্তিস্থল ছিলসিলেটশহরের পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। এই ধারাবাহিক ভূকম্পন জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, যদিও ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে দেশের বিভিন্ন এলাকা পরপর দুটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। ওই দুই কম্পনের মাত্রা রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ এবং ৫ দশমিক ২ রেকর্ড করা হয়। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উভয় কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশমিয়ানমার–এ।
সেই দিনের ভোরেকলারোয়া উপজেলা, সাতক্ষীরা জেলা–তে আরও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। এতে স্থানীয়ভাবে ছোট আকারের ঝাঁকুনি তৈরি হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এছাড়া চলতি মাসের ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারিগোয়াইনঘাট উপজেলা, সিলেট জেলা–এ দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার মাত্রা যথাক্রমে রিখটার স্কেলে ৩ দশমিক ৩ এবং ৪ রেকর্ড করা হয়। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারিছাতক উপজেলা, সুনামগঞ্জ জেলা–এ ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরও একটি কম্পন রেকর্ড করা হয়।
ঘনঘন ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনীয় বিধিমালা অনুসরণ করা এবং নাগরিক সচেতনতা ও প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি। এ ছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে যে কোনো অপ্রত্যাশিত ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, চলতি সময়ে অনুভূত মৃদু কম্পনগুলো বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবুও তারা সতর্কতা অবলম্বন ও সচেতনতা বৃদ্ধি করার গুরুত্ব জোর দিয়ে বলেছেন। নাগরিকদের উচিত ভবন নির্মাণের নিরাপত্তা, জরুরি প্রস্তুতি এবং ভূমিকম্পের সময় করণীয় বিষয়ে সচেতন থাকা।
এর আগে, গত বছরের ২১ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানীঢাকা–সহ দেশের বিভিন্ন জেলা শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে।United States Geological Survey–এর তথ্যানুসারে, ভূমিকম্পটির তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ রেকর্ড করা হয় এবং কেন্দ্রস্থল ছিলনরসিংদী জেলা। এটি বিগত বছরগুলোর মধ্যে দেশের অভিজ্ঞতাভুক্ত অন্যতম তীব্র ভূমিকম্প হিসেবে ধরা হয়।
ওইদিনের ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, নরসিংদী ওগাজীপুর জেলা–এ অন্তত তিন শিশুসহ ১১ জন নিহত হন। এছাড়া শতাধিক মানুষ আহত হন এবং বহু সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ওই দিনের ভূমিকম্প শুরু হতেই শহরের বিভিন্ন বহুতল ভবন থেকে মানুষজন দ্রুত নিচে নেমে আসতে গিয়ে বহু মানুষ আহত হন। বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, এত তীব্র ভূমিকম্প আগে কখনো অনুভব করেননি।
মোহাম্মদপুর–এর বাসিন্দাশায়লা পারভীনবলেন, “আমি রান্নাঘরে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো মেঝে দুলছে, প্রথমে বুঝিনি। যখন দেখি জিনিসপত্র পড়ে যাচ্ছে, তখন দৌড়ে নিচে নামি। জীবনে এমন কাঁপন আগে কখনো দেখিনি।”
গুলশান–এর একটি বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরফিক মিয়াজানান, “বিল্ডিংটা এতো জোরে দুলছিল, আমরা সবাই ভয়ে জমে গিয়েছিলাম। সবাই চিৎকার করতে করতে নিচে নামছিল।”



















