পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিয়োগে বিএনপিতে অস্বস্তি ও বিস্ময়

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ১২:২১ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬  
পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিয়োগে বিএনপিতে অস্বস্তি ও বিস্ময়

সদ্য সমাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আলোচনায় থাকা খলিলুর রহমান এবার নির্বাচিত বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তার এ নিয়োগে দলটির ভেতরেই বিস্ময়ের সুর শোনা যাচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনায় নেমেছে বিরোধী দলও।

বিএনপির একাধিক নেতা মনে করছেন, মি. রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তটি তাদের জন্য বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক। 
নানা ইস্যুতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও তাকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে দেখা গেছে। শুধু সমালোচনাতেই তারা থেমে থাকেননি; একপর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে তাকে অপসারণের দাবিও জানিয়েছিল দলটি।

সর্বশেষ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিএনপির ভেতর থেকেও আপত্তির সুর শোনা যায়। অভিযোগ ওঠে, চুক্তিতে দেশের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি।
চুক্তিকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিএনপির একাধিক নেতা প্রকাশ্যে মি. রহমানের সমালোচনা করেন।
তবে এসব আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও খলিলুর রহমানই জায়গা করে নিয়েছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে—যা নতুন মন্ত্রিসভার অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্ত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি কেন তাকে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিল?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে খলিলুর রহমান নিজেও বলেছেন, তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভায় ‘জোর করে’ আসেননি।

দলীয় অন্দরে বিস্ময় ও প্রশ্ন

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, আর স্বাভাবিকভাবেই নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হবে—তা নিয়ে শুরু হয় জোর আলোচনা।

সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ঘুরতে থাকে নানা তালিকা। সেখানে বিএনপির সিনিয়র-জুনিয়র নেতাদের পাশাপাশি মিত্র দলগুলোর প্রতিনিধিদের নামই বেশি উচ্চারিত হচ্ছিল।

কিন্তু মন্ত্রিসভা ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসে খলিলুর রহমানের নাম। সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত, কয়েকটি গণমাধ্যমও তাকে সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হয়—আর তাতেই বিস্মিত হন বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত সংসদ নেতার হাতেই থাকে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পূর্ণ এখতিয়ার। কাকে মন্ত্রী করা হবে, কাকে রাখা হবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি চাইলে পরামর্শ করতে পারেন, আবার একক সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।

এই বাস্তবতায় মন্ত্রিসভা ঘোষণার আগে সম্ভাব্য সদস্যদের নাম সাধারণত গোপনই থাকে। তবু রাজনৈতিক মহল ও সংবাদমাধ্যমে নানা নাম ঘুরতে থাকে—এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে খলিলুর রহমানের নামটি আলোচনায় আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খলিলুর রহমান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাবেন—এমন ধারণা তাদের ছিল না। সরকার গঠনের ঠিক আগে সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন বলে জানান। তাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন ইস্যুতে তার ভূমিকার সমালোচনা তারা নিজেরাও করেছেন; এমনকি তার পদত্যাগও চেয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে এখন নিজেদের সরকারের মন্ত্রিসভায় তার অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছে বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর মনে হয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়েও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া মিলেছে বলে জানা গেছে। কয়েকটি জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও এমন বিস্ময় ও প্রশ্নের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে দলের ভেতরেই ভিন্ন সুর রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ বলছেন, শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের পেছনে কৌশলগত বিবেচনা থাকতে পারে, এবং সে কারণেই তাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে।

আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল

বিএনপি সরকারের যাত্রার প্রথম দিন বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকায় সফররত নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্ন ছিল—অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচনে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে কি না। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, তিনি কারও ওপর চাপিয়ে আসেননি; দলের আহ্বানেই দায়িত্ব নিয়েছেন।তিনি আরও বলেন, “মানুষের একে অপর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকতে পারে, সময়ের সঙ্গে সেটি বদলাতেও পারে।”

আরেক প্রশ্নে সাংবাদিকরা জানতে চান, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কার্যত নির্বাচনের ‘রেফারি’র ভূমিকায় ছিলেন—এমন প্রেক্ষাপটে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় তার যোগদান নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা কি স্বার্থের সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়? এমনকি বিএনপির বিজয়ে আগের সরকারের সম্পৃক্ততা নিয়ে যে অভিযোগ উঠছে, সে বিষয়ে তার মন্তব্য কী।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “অনেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছেন। তার মানে গণনা ঠিক হয়নি—এটাই তো বলা হচ্ছে। তাহলে আবার গুণে দেখুন। গণনায় তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”

দলের পক্ষ থেকে তার পদত্যাগও চাওয়া হয়েছিল

খলিলুর রহমানকে প্রথমে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার মর্যাদায় নিযুক্ত করা হয়েছিল, এবং একই সময় তাকে রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই পদে থাকা অবস্থায় তার কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরের একাংশ তার পদক্ষেপ এবং নীতিগত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা তুলেছিল।

এরপর যখন তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখনও দলের ভেতর প্রশ্ন উঠেছিল। বিএনপির কিছু নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, এত স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়ায় জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা কীভাবে প্রভাবিত হবে। তার দায়িত্বের পরিধি এবং নীতি-নির্ধারণের ক্ষমতা নিয়েও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়।

উল্লেখযোগ্য যে, সেই সময়ে দলের কয়েকজন নেতা খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির নাগরিকত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই বিতর্ক বিএনপির ভেতরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোচনারও জন্ম দেয়।

ফলস্বরূপ, মি. রহমানের নাম যখন পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় আসার সম্ভাব্য তালিকায় আসে, তখন দলের ভেতর থেকেই বিস্ময় ও সংশয় প্রকাশ পায়। অনেকেই মনে করেন, আগের দায়িত্ব এবং উত্থাপিত প্রশ্নগুলো বিবেচনা করলে তার নতুন পদে নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে অপ্রত্যাশিত এবং কিছুটা বিব্রতকর।

দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা তখন অভিযোগ তোলেন, খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকার কারণে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এমন শঙ্কা ব্যক্ত করেন তারা।

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কক্সবাজারে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে ‘মানবিক করিডর’ খোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তখন খলিলুর রহমান এবং অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে হস্তান্তরের পরিকল্পনাকেও নিয়ে সরকারের বক্তব্য এবং পদক্ষেপ নানা ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষজ্ঞরা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, এমন স্পর্শকাতর এবং স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে দেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ফলশ্রুতিতে, খলিলুর রহমানের দায়িত্ব ও পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রতি আস্থা এবং সমালোচনার মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সেই পটভূমিতে ২০২৫ সালের ২২ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে খলিলুর রহমানের পদত্যাগের দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্য আবারও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাকে অব্যাহতি প্রদান করা উচিত। ফ্যাসিবাদের দোসর কয়েকজন উপদেষ্টাকে সরানোর দাবি আমরা ইতিপূর্বে অনেকবার তুলেছি।”

তৎকালীন সময়ে বিএনপি পক্ষ থেকে খলিলুর রহমানসহ কয়েকজন উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি প্রধান উপদেষ্টাকে লিখিতভাবেও জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর নিয়েও খলিলুর রহমানের সমালোচনা করেছিলেন বিএনপির অনেক নেতা। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি, চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছিলেন যে, এই চুক্তি দেশের স্বার্থের পক্ষে হয়নি এবং খলিলুর রহমানের কর্মকাণ্ডের কারণে তা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে ব্যক্তি সম্পর্কে এতদিন নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল এবং যার পদক্ষেপ নিয়ে দলের ভেতর সমালোচনা ও বিতর্ক চলছিল, তিনিই এখন নির্বাচিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। খলিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্বের নজর পড়বে বাংলাদেশের ওপর। এ কারণেই অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন বলে তারা মনে করছেন।

গ্রিন কার্ডধারী নাকি শুধুই বাংলাদেশি?

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালীন সময়ে খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছিল। বিএনপির একাংশের নেতারা অভিযোগ করেছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে খলিলুর রহমান সেই অভিযোগ সারা জীবন অস্বীকার করে আসছেন। তিনি নিজেই বারবার জানিয়েছেন, তিনিযুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ননএবং তার কাছেশুধুমাত্র বাংলাদেশের পাসপোর্ট আছে; অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, খলিলুর রহমান দুই যুগেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের কারণে নানা মহলে তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করলে দেখা যায়, খলিলুর রহমানের সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে রয়েছে।

একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, যদিও তিনি নাগরিকত্ব নেননি, খলিলুর রহমানযুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী হয়েছেন, যা তাকে সেখানে দীর্ঘ সময় স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড হল এমন একটি অনুমোদনপত্র যা বিভিন্ন আয়ের স্তরের অভিবাসীদের দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কর্মসংস্থান করার অধিকার দেয়। সাধারণত গ্রিন কার্ডধারীরাপাঁচ বছরের পর নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হন, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খলিলুর রহমানের দীর্ঘসময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস এবং তার সম্পদের বৈশ্বিক প্রকৃতি এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার নতুন দায়িত্বকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল এবং আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালীন সময়ে খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেছিল। বিএনপির একাংশের নেতারা অভিযোগ করেছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তবে খলিলুর রহমান সেই অভিযোগ সারা জীবন অস্বীকার করে আসছেন। তিনি নিজেই বারবার জানিয়েছেন, তিনিযুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ননএবং তার কাছেশুধুমাত্র বাংলাদেশের পাসপোর্ট আছে; অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, খলিলুর রহমান দুই যুগেরও বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের কারণে নানা মহলে তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করলে দেখা যায়, খলিলুর রহমানের সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে রয়েছে।

একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, যদিও তিনি নাগরিকত্ব নেননি, খলিলুর রহমানযুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী হয়েছেন, যা তাকে সেখানে দীর্ঘ সময় স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড হল এমন একটি অনুমোদনপত্র যা বিভিন্ন আয়ের স্তরের অভিবাসীদের দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কর্মসংস্থান করার অধিকার দেয়। সাধারণত গ্রিন কার্ডধারীরাপাঁচ বছরের পর নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হন, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খলিলুর রহমানের দীর্ঘসময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস এবং তার সম্পদের বৈশ্বিক প্রকৃতি এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার নতুন দায়িত্বকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল এবং আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় কেন সুযোগ দিলো বিএনপি?

বিএনপির কোনো নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করার পক্ষে বা বিপক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় বলেছেন, কূটনীতিতে মি. রহমানেরউচ্চ স্তরের পেশাদারিত্বরয়েছে।

বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এবং প্রতিবেশি দেশ ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রেক্ষাপটেবাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতেএকজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা জরুরি। বিএনপির নেতাদের মতে, খলিলুর রহমানকে সরকারে নেওয়ার ক্ষেত্রে মূলত এই দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য নেতারা মনে করছেন, নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নে এমন একজন প্রফেশনাল মুখ্য দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সাবেক কূটনীতিক বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তাদের মতে, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েএকই সময়ে বিএনপি নির্বাচনের দিনক্ষণ চেয়ে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছিল।

এই পটভূমিতে, গত বছরের জুন মাসে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডন সফরে যানসেখানে তিনি তখন নির্বাসনে থাকা বিএনপি চেয়ারম্যানতারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখান থেকেই পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা আসে। এই বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে খলিলুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন। কূটনীতিকদের দাবি অনুযায়ী, মি. রহমানও ওই বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন এবং তখন থেকেই তারেক রহমানের সঙ্গে তার নিয়মিত কথাবার্তা ও যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে।

সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, খলিলুর রহমানেররাজনৈতিক যোগসূত্র এবং কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করার দক্ষতাএই সময় আরও দৃঢ় হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান, খলিলুর রহমানকে তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ই মি. রহমানের সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বের সম্পর্ক শুরু হয় এবং সেটি ক্রমান্বয়ে মজবুত হতে থাকে।

খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তিনিনির্বাচন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির পক্ষে ভূমিকা রাখেনসূত্রটি আরও বলেছে, মি. রহমান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হন, যা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও দৃঢ় করে। কূটনীতিকদের মতে, এই দীর্ঘসময় ধরে তৈরি সম্পর্ক এবং পেশাগত দক্ষতা বিএনপিকে তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় ছাড়াওভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটনিয়েও মন্তব্য করেছেন একজন সাবেক কূটনীতিক। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগেযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছেএবং সেই চুক্তির বিভিন্ন শর্তের কারণে ঢাকায় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে চুক্তি নিয়ে বিরোধী মতামতও গড়ে উঠেছে।

কূটনীতিকের মতে, এই পরিস্থিতিতেচুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা বা তা বহাল রাখার বিষয়গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় খলিলুর রহমানের ভূমিকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

তাঁর আরও মন্তব্য, রোহিঙ্গা সংকটসহ আঞ্চলিক ও বৃহত্তর পরিসরের বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণএই প্রসঙ্গে খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা এবং পেশাদারিত্বকে সরকার সমর্থন হিসাবে বিবেচনা করতে পারে, যা তাকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থেকে মি. রহমানকে নির্বাচিত সরকারে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ থাকতে পারে, যা বিএনপি নেতৃত্ব বিবেচনায় নিয়েছে- এমন ধারণার কথাও বলছেন সাবেক ওই কূটনীতিক।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বিভিন্ন শর্ত আনা হয়েছে চীনকে টার্গেট করে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরাও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির শর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে কঠোর। এ চুক্তিতে দেশের স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি; বরং চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে সীমিত করে দিতে পারে।

খলিলুর রহমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতাই থাকতে পারে, এমন সন্দেহও প্রকাশ করছেন সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা রাখা হলে তাতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করা সহজ হবে।

এছাড়া বিএনপি যে কোনো একটি দেশ কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি বিরুদ্ধে, সেই কথা সঙ্গে বাস্তবতা ভিন্ন হবে। তখন সম্পর্ক শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে রেখে এক দেশ কেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ।

তবে সাবেক আরেকজন কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, প্রধানত বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই দলটির সরকারে জায়গা পেয়েছেন খলিলুর রহমান। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও একটি কারণ হতে পারে।

যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যাত্রার প্রথম দিনে বুধবার খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী তারা এগোবেন। সেখানে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করবেন তারা।

তবে এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন প্রশ্নে সন্দেহ রয়েছে কূটনীতি বিশ্লেষকদের অনেকের।

তথ্যসূত্র: বিবিসি


সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়