২০২৫ সালে যেসব বরেণ্য আলেমদের হারাল বিশ্ব

গাজীপুর নিউজ ২৪|| প্রকাশিত: ০৮:৫০ এম, ০২ জানুয়ারী ২০২৬  
২০২৫ সালে যেসব বরেণ্য আলেমদের হারাল বিশ্ব

শায়খ সারিয়া আব্দুল কারিম আল রিফায়ী

প্রত্যেক প্রাণীই তার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে তা চিরন্তন সত্য। এ পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকে না। জন্মিলে মরিতে হবে। এ পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে তা কিছু মহব্বতের বান্দাকে দিয়ে কিছু খেদমত নেন। দুনিয়ার জমিনে আল্লাহ তায়ালার বার্তা বাহক হয়ে তারা আলো ছড়ান। তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন বরেণ্য আলেম ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেন। বরেণ্য আলেমদের মধ্যে অন্যতম সিরীয় আলেম শায়খ সারিয়া আব্দুল কারিম আল রিফায়ী।

শায়খ রিফায়ী গত বছরের ৬ জানুয়ারি (সোমবার) তিনি মারা যান। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তুরস্কে নির্বাসিত ছিলেন। ৭৭ বছর বয়সে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তিনি মারা যান। শায়খ সারিয়া আব্দুল কারিম আল রিফায়ী ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থক ছিলেন। শায়খ সারিয়া আব্দুল কারিম আল রিফায়ী ১৯৪৮ সালে দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শায়খ আব্দুল কারিম আল রিফায়ী সিরিয়ার প্রসিদ্ধ আলেমদের একজন। তিনি বাবার কাছে বেড়ে উঠেছেন। তিনি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দামেস্কে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উসুলদ্ব দ্বীন ও তাফসির বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি কয়েক বছর সিরিয়ান আরব প্রজাতন্ত্রের সাবেক মুফতি শায়খ আবি ইসার আবিদিনের কাছে থেকে আরবি ও হানাফী ফিকাহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।

শেখ মোস্তফা দাব্বাগ

মসজিদুল হারামের জনপ্রিয় গাইড শায়খ মোস্তফা আল-দাব্বাগ ১৪ জানুয়ারি (মঙ্গলবার ২০২৫) মারা যান। তার ইন্তেকালে হারমাইন শরিফাইন কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করে। তিনি পবিত্র মসজিদে আগত হাজি ও ইবাদতকারীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। নিঃস্বার্থ সেবার জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। তিনি হাজিদের সঠিক নিয়ম মেনে তাওয়াফ, সাঈ ও অন্যান্য ইবাদত করার পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন। মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ বুস্তানবী উপমহাদেশের প্রখ্যাত দীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ বুস্তানবী গত বছরের ৪ মে (রোববার) মারা যান। দেওবন্দের দীর্ঘকালীন মুহতামিম মাওলানা মারগুবুর রহমানের ইন্তেকালের পর মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ বুস্তানবী দেওবন্দের মুহতামিম হয়েছিলেন। তিনি ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই ২০১১ স্বল্প সময়ের মুহতামিম ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি নরেন্দ্র মোদির প্রশংসা করলে তাকে দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিমের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

মাওলানা মুহাম্মদ সাঈদী

ভারতের উত্তর প্রদেশের বিখ্যাত দীনি বিদ্যাপীঠ মাজাহিরুল উলুম (ওয়াকফ) সাহারানপুরের মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ সাঈদী মারা যান ২০২৫ সালের ৪ জুন (বুধবার)। মাওলানা মুহাম্মদ সাঈদ ২০০৩ সাল থেকে মাজাহিরুল উলুমের মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রায় ২২ বছর বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নতি ও সুনাম সাধিত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ সাঈদীর জন্ম ১৯৭০ সালে। পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। কোরআন হিফজ করেন মাদরাসা মাজাহিরুল উলুমে (ওয়াকফ)। ১৪০৯ হিজরিতে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

শায়খ আবদুল আজিজ

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও দেশটির সিনিয়র ওলামা পরিষদের প্রধান শায়খ আবদুল আজিজ আল-শায়খ ইন্তেকাল করেন ২৩ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার)। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। ১৯৯৯ সালে শায়খ আবদুল আজিজ আল-শায়খ সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি সিনিয়র ওলামা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইসলামী গবেষণা ও ইফতা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রী পর্যায়ের মর্যাদা ভোগ করছিলেন।

শায়খ মুহাম্মদ বিন ইবরাহিম আল-শায়খ ও শেখ আবদুল আজিজ বিন বাযের পর তিনি দেশটির তৃতীয় গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে এই দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪৩ সালের ৩০ নভেম্বর মক্কায় জন্ম নেন শায়খ আবদুল আজিজ আল-শায়খ। তিনি আট বছর বয়সের আগেই বাবাকে হারান। শৈশবেই কোরআন হিফজ করেন এবং ২০ বছর বয়সে এক চোখের দৃষ্টি হারান। এরপরও শরিয়াহ শিক্ষায় অগ্রসর হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন, রিয়াদের ইমাম তুর্কি বিন আব্দুল্লাহ মসজিদে ইমামতি ও জুমার খুতবা দিতেন। আরাফাতের নামাজের স্থান ঐতিহাসিক নামিরাহ মসজিদেরও অন্যতম খতিব ছিলেন তিনি।

আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ

সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম ও মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের (এমডব্লিউএল) সাবেক মহাসচিব আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ ইন্তেকাল করেন ১৩ অক্টোবর। তিনি ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, আন্তর্জাতিক ইসলামি রিলিফ অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ল্ড মুসলিম কংগ্রেস এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী দাওয়াহ ও রিলিফ কাউন্সিলের মহাসচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিশ্ব স্কাউট কমিটি এবং মুসলিম স্কাউটসের আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৯১ সালে ইসলামী শিক্ষা, নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদানের জন্য তিনি কিং ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন।

ড. জাগলুল নাজ্জার

বিশ্ববিখ্যাত কোরআন গবেষক, ভূতত্ত্ববিদ ও ইসলামি পণ্ডিত মিসরের ড. জাগলুল নাজ্জার ইন্তেকাল করেন ৯ নভেম্বর (রোববার)। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে ৯২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন তিনি। ড. জাগলুল নাজ্জার ১৯৩৩ সালের ১৭ নভেম্বর মিসরে জন্মগ্রহণ করেন। ভূতত্ত্ববিদ হওয়া সত্ত্বেও কোরআনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং মহাজাগতিক আয়াতের তাফসিরের মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত ‘তফসিরুল আয়াত আল-কাওনিয়্যা’ গ্রন্থটি কোরআনের আয়াতসমূহের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপস্থাপনের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি কায়রোর ইসলামিক বিষয়ক সুপ্রিম কাউন্সিলের ‘কমিটি অন সায়েন্টিফিক কনসেপ্টস ইন দ্য হোলি কোরআন’ এর চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন।

পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দি

নকশবন্দি তরিকার খ্যাতিমান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও পাকিস্তানের জনপ্রিয় আলেম পীর মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দি ইন্তেকাল করেন ১৪ ডিসেম্বর। পীর মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দির সঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল। তিনি ১৯৫৩ সালের ১ এপ্রিল পাকিস্তানের ঝং শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের পুরো সময় তিনি ইসলাম প্রচার ও প্রসারে নিবেদিত ছিলেন। বিশেষভাবে তাসাউফ, শরিয়ত ও সুলুকের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষকে দ্বীনের প্রকৃত বার্তার সঙ্গে পরিচিত করানো ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। তার চিন্তাধারা, বয়ান, গ্রন্থ ও আধ্যাত্মিক সাধনা অসংখ্য মানুষের জীবনে হেদায়াত ও আলোর পথ দেখিয়েছে। তার ইন্তেকালে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শায়খ ফয়সাল নোমান

মসজিদে নববীর প্রবীণ মুয়াজ্জিন শায়খ ফয়সাল বিন আবদুল মালিক নোমান ইন্তেকাল করেন ২৩ ডিসেম্বর। দীর্ঘ কর্মজীবনে শায়খ ফয়সাল বিন আবদুল মালিক নোমান মসজিদে নববীর একাধিক সম্প্রসারণ কাজের সাক্ষী ছিলেন। প্রতি বছর রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারাবিহ ও কিয়ামুল লাইল পড়তে মসজিদে নববীতে সমাবেত হন লাখো মুসল্লি। লাখ লাখ মুসল্লিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জামাতে আজানের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০১ সালে মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ পান শায়খ ফয়সাল বিন আবদুল মালিক নোমান। তার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে মসজিদে নববীতে আজান দেওয়ার সম্মান লাভ করেছে। তার দাদা ছিলেন মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন। তার পিতাও মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে এই দায়িত্বে নিযুক্ত হন এবং নব্বই বছরের বেশি বয়স পর্যন্ত দশকের পর দশক নিষ্ঠার সঙ্গে আজান দিয়ে গেছেন। শায়খ ফয়সাল বিন আবদুল মালিক নোমান ২০০১ থেকে ২০২৫ (১৪২২ থেকে ১৪৪৭ হিজরি ) পর্যন্ত টানা ২৫ বছর ধরে আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়