যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে সেনা সরাচ্ছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্র আগামী কয়েক মাসের মধ্যেসিরিয়ায় তাদের অবশিষ্ট সেনা বাহিনীর বড় অংশ প্রত্যাহারের প্রস্তুতিনিচ্ছে। এ তথ্যটি প্রকাশ করেছেন হোয়াইট হাউজের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি বিবিসিকে জানান, এই পরিকল্পনা কৌশলগত ও নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তার মতে, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে ছিল। দেশটি ইরান এবং স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে অবস্থান করায়, অবশিষ্ট বাহিনীর কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে এই প্রত্যাহার প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনী মূলত স্থানীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক সহায়তার জন্য উপস্থিত ছিল। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রত্যাহার করা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কৌশলগত এলাকায় পুনর্বিন্যস্ত করা হবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব এবং প্রতিরক্ষা শক্তি বজায় থাকে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ শুধু সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইরান ও সিরিয়ার পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় এবং এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউজের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়ার ভেতরে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নেতৃত্ব এখন দেশটির সরকারই নেবে, তাই ‘বৃহৎ পরিসরে’ মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আর প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, মার্কিন বাহিনী স্থানীয় সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে সীমিত সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
২০১৫ সাল থেকে মার্কিন সেনারা সিরিয়ায় অবস্থান করছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস)-এর প্রভাব মোকাবিলায়সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা, যাতে স্থানীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার সময় প্রেসিডেন্টডোনাল্ড ট্রাম্পমধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেন। সেই পরিস্থিতিতেই সিরিয়ার অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে, যা কৌশলগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তা আরও জানান, সিরিয়ায় প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি শর্তসাপেক্ষ রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ, এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনও অঞ্চলটির যে কোনো হুমকির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকবে। অর্থাৎ সেনা প্রত্যাহার মানেসিরিয়ায় মার্কিন নিরাপত্তা স্বার্থ কমানো নয়, বরং কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে এটি দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ মার্কিন সামরিক কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এটি ইরান, সিরিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক স্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রথম প্রকাশিত এই খবরটি এসেছে এমন সময় যখনমধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের নিকটবর্তী এলাকায়, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রেরবিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, যার মধ্যে রয়েছেগাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং অসংখ্য যুদ্ধবিমান, ইতিমধ্যেই ইরানের নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থান করছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করার অংশ।
এর পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এই জাহাজ আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছাবে এবং মার্কিন সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেরজ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারাবিবিসির অংশীদার সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টডোনাল্ড ট্রাম্পবলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীশনিবার থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুত থাকবে, যদিও প্রেসিডেন্ট এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। কর্মকর্তারা আরও উল্লেখ করেছেন, এই প্রস্তুতিমধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তা রক্ষাকরার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের শুরুতেই সিরিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ত্যাগ করেছে—দক্ষিণাঞ্চলেরআল-তানফ গ্যারিসনএবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলেরআল-শাদ্দাদি ঘাঁটি। এই পদক্ষেপগুলো আসে২০২৪ সালে আসাদ সরকারের পতন এবং সিরিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে, যখন আইএসআইএসের প্রভাব অনেকাংশে দুর্বল হয়ে গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এরপর থেকেদামেস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে শুরু করেছেএবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্টআহমেদ আল-শারা-র সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, শারাগত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যা সিরিয়ার কোনো নেতার জন্য এ ধরনের প্রথম সফর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ার ঘাঁটি প্রত্যাহার এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের এই পদক্ষেপগুলো ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মার্কিন নীতি ও সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
সিরিয়ার সরকার কিছু সময়স্থানীয় সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে জড়ালেও, জানুয়ারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেকুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হবে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ সামরিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে সহায়ক হবে।
এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীমার্কো রুবিওগত সপ্তাহে সিরিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীআসাদ আল-শাইবানি-র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে মূল আলোচনার বিষয় ছিলযুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতা। রুবিও নিজের উদ্বেগও প্রকাশ করেন যে, আইএসআইএস বা অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান রোধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মনিটরিং এবং সমন্বয় অব্যাহত থাকতে হবে।
গত ডিসেম্বরে সিরিয়ার অবস্থানে ঘটে একটি হত্যাকাণ্ড, যেখানেএকজন দোভাষী ও আইওয়া ন্যাশনাল গার্ডের দুই সদস্যএকক আইএসআইএস বন্দুকধারীর হামলায় নিহত হন, বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন হকআই স্ট্রাইক’নামে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিরিয়ায় এই ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো মার্কিন নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার অংশ। বিশেষ করে এসডিএফ এবং সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একীকরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সংঘাত কমানো এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে সমন্বিত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।



















