ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু, দায় সরকারি অবহেলার—বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। চলতি নভেম্বরের শুরু থেকেই প্রতিদিন বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১০ জন, যা চলতি বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ডেঙ্গুতে এক দিনে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে সে সময়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, তিনজনের মৃত্যু ঘটেছিল আগের দিন। সে হিসেবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর সংখ্যা এ বছর সর্বাধিক। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এক দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬৯ জন। বর্তমানে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৯৯২।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে—এর মধ্যে তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দুইজন ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। উত্তর সিটি করপোরেশনে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে—দুজন কুর্মিটোলা জেনারেল ও একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া ভোলা ও খুলনায় দুইজন মারা গেছেন।
এ সময় ঢাকায় ৪০৮ জন এবং ঢাকার বাইরে সর্বাধিক সংক্রমণ দেখা গেছে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় (২১৪ জন)। এর মধ্যে গাজীপুরে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ, ৬৫ জন। বরিশাল বিভাগেও সংক্রমণ বেড়েছে, এক দিনে নতুন রোগী পাওয়া গেছে ১২৮ জন, যার মধ্যে বরগুনায় ৪৭ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “প্রতিটি মৃত্যুই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না করে একই ধাঁচের ব্যবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলা করায় এই বিপর্যয় ঘটেছে। সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এসব মৃত্যু সরকারি অবহেলার ফল ছাড়া কিছু নয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছরের শুরুতেই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার আশঙ্কা জানানো হয়েছিল। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টি ও অনুকূল তাপমাত্রা এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করলেও স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও যথাসময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অক্টোবরে এসে তারা জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়, কিন্তু সহজ ও কম খরচে পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হলেও পৌরসভা ও পরিষদগুলো ভেঙে দেওয়ার কারণে সেই ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা না থাকায় মশকনিধন কার্যক্রমও কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
অক্টোবরের শেষ দিকের বৃষ্টি ও নভেম্বরের শুরুতে অনুকূল আবহাওয়া ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।



















