Breaking News
Home / ধর্ম / দেখ সে ভেতরে মানুষ কি না ?

দেখ সে ভেতরে মানুষ কি না ?

একজন কবি একটি সুন্দর কবিতা রচনা করলেন তার দেশের বাদশাহর প্রশংসায়। আগেকার দিনের দরবারি কবিরা এমনটি করতেন রাজকীয় উপহার, পদ বা অর্থবিত্ত লাভের আশায়। কবি তদবির করে একদিন বাদশাহর দরবার হলে বরিত হলেন। রাজা নিজে, উজির ও সভাসদরা উপস্থিত ছিলেন জলসায়। হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দরাজ কণ্ঠে কবিতাটি পাঠ করলেন কবিবর। ধন্য ধন্য রব উঠল, বাদশাহর দরবার আজ গুলে গুলজার। বাদশাহ নিজেই কবির প্রতিভায় মুগ্ধ। তিনি নির্দেশ দিলেন, রাজকোষ থেকে কবিকে এক হাজার দিনার বখশিশ দাও। রাজার মন্ত্রী ছিলেন উদারদিল, রুচিশীল, উন্নত চরিত্রের অসম্ভব ভদ্রলোক।

মন্ত্রী বাদশাহর কাছে আরজ করলেন। জাহাঁপনা! এমন প্রতিভাধর কবির জন্য এই বখশিশ নেহাৎ নগণ্য। তাকে যদি দশ হাজার দিনার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন, আপনার সম্মান বাড়বে। মন্ত্রী সুন্দর সাবলীল ভাষায় যুক্তি দিয়ে বোঝালেন। বাদশাহও রাজি হয়ে গেলেন। বাদশাহ নির্দেশ দিলেন, হ্যাঁ। কবিকে দশ হাজার দিনার স্বর্ণমুদ্রা উপহার দাও। তদুপরি রাজকীয় উত্তরীয় পরিয়ে তাকে সম্মানিত কর। কবি যুগপৎ অবাক, আনন্দে আত্মহারা। তিনি ভাবতেই পারেননি, কেউ কবিতা লিখে এত বিশাল বকশিশ পায়। চিন্তা করেন, এত বড় বকশিশের পেছনে কবিতার শক্তি নয়, অন্য কোনো শক্তির হাত আছে। তিনি জানতে চাইলেন, এমন বিরাট সম্মান কীভাবে তার ভাগ্যে জুটল। পস বেগুফতান্দাশ ফোলান উদ্দীন ওজীর অ’ন হাসান না’ম ও হাসান খুলক ও যমীর লোকেরা তাকে বলল, অমুক উদ্দীন মন্ত্রীবর হাসান নাম, অর্থের মতো সুন্দর চরিত্র ও অন্তর। রাজ দরবারের লোকেরা কবিকে জানাল, আপনার জন্য এত বিরাট সম্মান ও অর্থ উপঢৌকনের অনুঘটক হলেন প্রধানমন্ত্রী। তার নাম হাসান। হাসান মানে সুন্দর। নামের অর্থের মতোই মন্ত্রীর চরিত্র যেমন সুন্দর, মনটাও তেমনি সুন্দর।

উদারদিল প্রধানমন্ত্রীই আপনার জন্য এতকিছু করেছেন। কবি ভাবলেন, কীভাবে এর শুকরিয়া আদায় করা যায়। কবি ও লেখকদের তো লেখনী ছাড়া কোনো সম্বল থাকে না। তিনি নতুন আরেকটি কবিতা রচনা করলেন উজিরকে সম্বোধন করে। কবিতার ভাষা ও ভাব যদিও মন্ত্রীর প্রশংসায় মুখরিত ছিল; কিন্তু শব্দের শরীর ও ছন্দের বিন্যাসের অন্তরালে লুক্কায়িত ছিল বাদশাহর অবারিত অনুগ্রহ অনুদানের কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা। বিরাট বিশাল সম্মান ও অনুদান নিয়ে কবি চলে এলেন নিজ এলাকায়। লেখক-সাহিত্যিক-কবিদের কপালের যে দশা, তার শিকার হলো আবারও কবি। অভাব টানাপড়েনে কবির মন আবারও কথা বলল, বাদশাহর কাছে যাও। আরেকটি কবিতা লিখে ভাগ্য খোলার ব্যবস্থা কর। অতীতের রাজকীয় উপহারের স্মৃতি কবির মনে আশা ও আনন্দের আলো জে¦লে দিল। সেই আলোর নিচে বসে তিনি রচনা করলেন অনেক দীর্ঘ এক প্রশস্তি। প্রতিভা উজাড় করে লেখা কবিতাটি নিয়ে চলে যান রাজদরবারে। তার মনে উঁকি দেয় আগের চেয়ে বেশি বকশিশ লাভের হিসাব নিকাশ। মওলানা রুমি বলেন, কবির উচিত ছিল নিজের প্রয়োজন মিটানোর জন্য মানুষের কাছে ধরনা না দিয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়া। কারণ, বিশ^বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক সিবওয়াইহ আল্লাহর নামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেছেন। মা’নিয়ে আল্লাহ গোফত অন সিবওয়াইহ ইয়ালাহুনা ফিল হাওয়ায়েজ হুম লদাইহ্ আল্লাহ শব্দের অর্থ করেছেন খ্যাতিমান সিবওয়াইহ জীবনযাত্রার প্রয়োজনে আশ্রয় নেয় যার কাছে সবাই।

গোফত আ’লেহ্না ফী হাওয়ায়েজ্না ইলাইক ওয়াল তামাস্না’হা ওয়াজাদনা’হা লদাইক বলেন, আমাদের আশ্রয় দাও তোমার প্রয়োজন পূরণে তোমার কাছে ধরনা দিয়ে পেয়েছি তা তোমার সন্নিধানে। মওলানা বলেন, কোনো পাগলকেও কী দেখেছ যে, কোনো কৃপণ বা অক্ষম লোকের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পেতেছে? কাজেই জ্ঞানীগুণীরা যে হাজারো লাখোবার আল্লাহর কাছে ধরনা দিয়েছেন, তা অমূলক নয়। কারণ, তিনি দয়াবান। দয়ার আধার। তার দান সৃষ্টির সর্বত্র অবারিত বিরাজিত। শুধু জ্ঞানবান মানুষ কেন, সাগরের বুকে ঢেউয়ের দোলায় মাছেরা, বাতাসের কোলে আকাশের উড়ন্ত পাখিরা তারই রহমতের ছায়ায় দোল খায়। বনের হিংস্র প্রাণী হাতি, বাঘ, ভল্লুক, শ্বাপদ, আজদাহা, পিঁপড়ারাও তার অবারিত রহমতের পরশ পায়। মাটি, বাতাস, পানি ও আগুন তার কাছ থেকেই শক্তির জোগান পায়। শীত-বসন্তের পরতে পরতে তারই দানের ছড়াছড়ি। আকাশ তো অনুক্ষণ কাঁদে কাতর কণ্ঠে, প্রভুহে! এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে ছেড়ে দিও না আমার নিজের ওপর। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাব, খান খান হয়ে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ব। প্রশ্ন হলো, আল্লাহর অফুরন্ত রহমত, অবারিত সাহায্য কীভাবে কুড়িয়ে নিতে পারবে বান্দা। মওলানা সমাধান দিয়েছেন, এই মর্মে প্রত্যেক নবী আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন অমোঘ বিধান ‘তোমরা সাহায্য চাও ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে।’ হার নবী যু বর আওয়ার্দে বরাত ইস্তায়ীনু মিনহু সাবরান আউ সালাত প্রত্যেক নবী নিয়ে এসেছেন ফরমান আল্লাহর সাহায্য চাও তার, ধৈর্য ও নামাজ হোক মাধ্যম তার। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা বাকারা : ১৫৩)। হীন আযু খা’হীদ ন আয গেইরে উ আব দর য়াম জূ নাজূ দর খোশক জূ আশা পূরণ চাও, শুধু তার কাছে, অন্যের কাছে নয় পানি মাগো সাগর হতে মরা গাঙ্গের কাছে নয়। কবি সৃষ্টিলোকের এই হকিকত জানতেন না। জানলেও আমলে নিলেন না। অভাবের তাড়ায় আবারও গেলেন রাজদরবারে বকশিশের আশায়। কবিতা পাঠ করলেন। চারিদিকে বাহবা ধ্বনি অনুরণিত হলো। বাদশাহ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নির্দেশ দিলেন, কবিকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা বখশিশ দাও।

কিন্তু আগেরবারে যে মন্ত্রীর বদান্যতায় কপাল খুলেছিল এরই মধ্যে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। নবনিযুক্ত মন্ত্রী স্বভাব চরিত্রে আগের মন্ত্রীর ঠিক বিপরীত। কৃপণ, স্বার্থপর, দয়ামায়াহীন, হিংসুটে। কবিকে এত টাকা দেওয়ার হুকুম হয়েছে শুনে মন্ত্রী তড়িঘড়ি বাদশাহর কাছে গেলেন। বিনয়ের সঙ্গে বললেন, জাহাঁপনা! আমাদের তো রাষ্ট্রীয় খরচপাতির অনেক খাতে প্রচুর অর্থের দরকার। একজন কবিকে এত বিপুল টাকা দেওয়া হলে অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হবে। এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা তার জন্য অনেক অনেক বেশি। আপনি আনুমতি দিন, আমি তাকে এক হাজারের এক দশমাংশের চার ভাগের এক ভাগ দিয়ে রাজি খুশি করব। অর্থাৎ মাত্র ২৫ দিনার। আশপাশের লোকেরা মন্ত্রীকে বলল, এই কবি আগেরবার ১০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার পেয়েছিলেন। মিষ্টান্ন খাওয়ানোর পর এখন তাকে কীভাবে আখ ধরিয়ে দেবেন? নতুন মন্ত্রী বললেন, আপনারা দেখবেন, আমি কবিবরকে আজ নয়, কাল ওয়াদার পেছনে ঝুলিয়ে রাখব। অবস্থা দাঁড়াবে, তাকে যদি এক মুষ্টি মাটিও দেই, ফুলের পাপড়ির মতো আমার হাত থেকে তুলে নেবে। মন্ত্রীর যুক্তি শুনে বাদশাহ বললেন, সে যাই হোক। আমি চাই কবি যেন খুশি হয়, বেজার যেন না হয়। কারণ, কবি আমার প্রশংসা করেছে। আমার ভালো কাজগুলো সুন্দররূপে ফুটিয়ে তুলেছে। মন্ত্রী বললেন, জাহাঁপনা! আপনি চিন্তা করবেন না। একজন নয় তার মতো ১০০ জনকে আমি খুশি করব। কবি জানেন না, অন্দর মহলে তার ভাগ্যের গুড়ে কীভাবে বালি পড়ল। তাকে বলা হলো, পরে যোগাযোগ করবেন। আপনার বকশিশ নিয়ে যাবেন। তারপর থেকে কবি আসেন, ধরনা দেন। সাক্ষাৎ হয় না বাদশাহর বা মন্ত্রীর। শুরু হলো অপেক্ষার পালা। সপ্তাহর পর মাস, মাসের পর বছর চলে যায় স্তুতিগায়ক কবির অপেক্ষার শেষ হয় না। অতিষ্ঠ হয়ে একদিন মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় প্রার্থনা করলেন। কবি মনের আক্ষেপে মন্ত্রীকে বললেন, অপেক্ষার পর অপেক্ষায় জানটা তো বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার সিদ্ধান্ত যদি না থাকে আমাকে অন্তত গালমন্দ করে তাড়িয়ে দিন। যাতে আর কোনো দিন কিছু পাওয়ার আশায় রাজদরবারে না আসি। তাতে অন্তত আমার মনটা জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পাবে। এন্তেযারম কোশত বারি গো বরো তা রাহাদ ইন জানে মিসকীন আয গেরো অপেক্ষায় প্রাণটা বেরিয়ে গেল বল দূর হয়ে যাও এই মিসকিন প্রাণ যেন জিম্মিদশা হতে হয় মুক্ত। মন্ত্রী দেখলেন তার উদ্দেশ্য সফল। তার কৌশল পুরোপুরি কাজ দিয়েছে। কবিকে বললেন, হ্যাঁ, তাই তো। এত অপেক্ষা করবেন কোন যুক্তিতে। নেন, আপনার বখশিশ নিয়ে যান। এই বলে ২৫টি দিনারের পোটলা কবির হাতে দিলেন। বেরিয়ে এসে কবি তো অবাক। এতদিন জানকান্দানির পর এমন বঞ্চনার তো অর্থ হয় না।

দরবারের লোকদের কাছে জানতে চাইলেন। আগেরবার এসেছিলাম এত বিপুল বকশিশ আমাকে দেওয়া হয়েছিল, তাও নগদ। এবার এমনভাবে ঠকলাম। কারণটা কী। লোকেরা বলল, যেটুকু পেয়েছেন আল্লাহর শোকর করেন। তাড়াতাড়ি ভাগেন। কারণ এই মন্ত্রী অনুতপ্ত হতে পারেন। তখন কৌশলে এই ২৫ মুদ্রাও ফেরত চেয়ে বসবেন। আগের মন্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন। এখনকার মন্ত্রী বড় পাজি। কবি মন্ত্রীর নাম জানতে চাইলেন। লোকেরা বলল, হাসান। কবি বলেন, আশ্চর্য! আগের মন্ত্রীর নামও তো ছিল হাসান। আগের মন্ত্রী হাসান ছিলেন ভেতরে বাইরে কত সুন্দর। আর এই মন্ত্রী হাসান নাম ধারণ করেও কত কুৎসিত তার ভেতর। মওলানা রুমি বলেন, হ্যাঁ ভাই। বাইরের বেশভূষা আকৃতিতে এক রকম হলেও ভেতরে সবাই এক রকম হয় না। বহু বদকার আছে, নেককারের বেশ ধারণ করে আছে। দৈত্য স্বভাবের লোকেরাও ফেরেশতার সুরত ধারণ করে। কাজেই কারও নামধাম, লকব উপাধি খ্যাতি দেখে তার প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় মূল্যায়ন করো না। অবশ্যই পরীক্ষা কর, তার ভেতরের পরিচয় জানার চেষ্টা কর। দেখ সে ভেতরে মানুষ কি না। শুধু নামধাম বেশভূষা দেখে সিদ্ধান্ত নিলে প্রতারিত হবে। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৪খ. বয়েত, ১১৫৬-১২৩৯)

About admin

Check Also

হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ইন্তেকাল করেছেন।

হেফাজত ইসলামের আমির শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com